দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে দুর্বল বাংলাদেশের ব্যাংক খাত

দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে দুর্বল বাংলাদেশের ব্যাংক খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিআরএআর) ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং মানদণ্ড 'ব্যাসেল-৩' অনুযায়ী যেখানে ব্যাংকগুলোর ন্যূনতম সিআরএআর ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান ঋণাত্মক অবস্থান পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

 

​দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের এই দুর্বলতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। বর্তমানে ভারতের ব্যাংক খাতের গড় সিআরএআর প্রায় ১৭ শতাংশ, পাকিস্তানে ২০ শতাংশের বেশি এবং শ্রীলঙ্কায় ১৯ শতাংশের বেশি। অথচ, এই অঞ্চলের অন্যতম বড় অর্থনীতির দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন ঋণাত্মক মূলধন পর্যাপ্ততার অবস্থানে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তিকে মারাত্মক সংকটে ফেলেছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

 

​বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ২০টি ব্যাংক ভয়াবহ মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে, যাদের সম্মিলিত ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি। ২০২৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ শতাংশেরও বেশি। বিপুল এই খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে না পারায় ব্যাংকগুলোর মূলধন প্রতিনিয়ত ক্ষয়ে যাচ্ছে।

 

​সবচেয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র দেখা গেছে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোতে। সাতটি ইসলামী ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি ১ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংক বিশাল খেলাপি ঋণের কারণে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে রয়েছে।

 

​অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, কেবল পুনঃতফসিল বা সাময়িক নীতিগত সহায়তা দিয়ে এই গভীর ক্ষত সারানো সম্ভব নয়। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর আইনি পদক্ষেপ, ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ অনুমোদন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে, দুর্বল ব্যাংকগুলোর দ্রুত পুনর্গঠন এবং নতুন মূলধন জোগানের বিষয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্যাংকিং খাতের এই ভঙ্গুরতা রোধ করা সম্ভব না হলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।