পাহাড় সমান ঋণে অস্তিত্ব সংকটে বিডি থাই ফুড, ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত বিনিয়োগকারী-কর্মী

পাহাড় সমান ঋণে অস্তিত্ব সংকটে বিডি থাই ফুড, ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত বিনিয়োগকারী-কর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক: অস্তিত্ব সংকটে বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতেরকোম্পানিটি ব্যাংক ঋণে জর্জরিত। শুধু কি তাই? কোম্পানিটিরবিক্রয় রাজস্বে দিন দিন আশঙ্কাজনকহারে ভাটা পড়ছে। এছাড়াও অগ্রিম আদায়ে অনিশ্চয়তা, বিপুল পরিমাণ মজুদ পণ্য উৎপাদনের কাজে ব্যবহার না হয়ে আটকেথাকার কারণে কোম্পানিটির ব্যবসা এখন তলানিতে। এমন পরিস্থিতি থেকে কোম্পানিটি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয়প্রকাশ করেছে নিরীক্ষকসহ বাজার সংশ্লিষ্টরা।

 

সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করে বলেন, তালিকা ভুক্তির পর থেকেই নাটক শুরু করেছে বিডি থাই ফুড। তালিকাভুক্তির পর থেকে এখন পর্যন্ত কাঙ্খিত ডিভিডেন্ড (লভ্যাংশ) প্রদান করেনি কোম্পানিটি।  ২০২৪, ২০২৫  ওচলতি বছরে কারখানার মালামাল লুট হয়েছে বলে গণমাধ্যমসহ বাজার সংশ্লিষ্টদের জানিয়েছে কোম্পানিটি। সত‌্যিই মালামাল লুট হয়েছে নাকি নিজেদের দুর্বলতা  ও দুর্নীতি গোপন করতে কারখানা লুটের নাটক সাজাচ্ছে বিডি থাই ফুড?; তদন্ত সাপেক্ষে তা বের করাউচিত নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি)।

 

সম্প্রতি বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কর্তৃপক্ষ তাদের কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনায় অন্য দুই কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে কোম্পানির লাভজনকতা বৃদ্ধি পাবে এবং একই সঙ্গে শেয়ারহোল্ডার ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে বলে জানিয়েছে বিডি থাই ফুড।

 

তবে এ বিষয়ে বাজার সংশ্লষ্টরা জানান, অনেক কোম্পানি রয়েছে চাকচিক্য চুক্তি স্বাক্ষর দেখিয়ে কারসাজিকারকদের সাথে হাত মিলিয়ে শেয়ার দর বৃদ্ধি করে। পরবর্তীতে উচ্চ দামে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে শেয়ার বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে মার্কেট থেকে চলে যায় তারা। এবং মার্কেট থেকে চলে যাওয়ার কারণে সেই শেয়ারের দর আশঙ্কাজনক হারেকমে যায়। উচ্চ দামে কেনা শেয়ারগুলো তখন অসহায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা না পারে বিক্রিকরতে না পারে ধরেরাখতে। কোটি কোটি টাকা লোকসানের কবলে পড়ে দুর্বিসহ জীবন-যাপন করে তারা।

 

সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, ইতিমধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর পরবর্তী বিডি থাই ফুডের শেয়ার দর বাড়তে শুরু করেছে। চুক্তির বাস্তবায়ন না দেখা পর্যন্ত বিডি থাই ফুডের শেয়ারে বিনিয়োগ করার ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত বলে মনে করেন। কারণ কোম্পানিটির বর্তমান অবস্থা এতোটাই খারাপ যে, এখান থেকে উত্তরণ ঘটবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

 

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, বিডি থাই ফুডের বিদায়ী বছরে (৩০ জুন ২০২৫) মোট ব্যাংক ঋণ (স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী) রয়েছে ১২৯ কোটি ৪০ লাখ ২০৯ টাকা। এই ঋণের বিপরীতে মোট ব্যাংক ইন্টারেস্ট (সুদ) দিতে হয়েছে ১৫ কোটি ৬৩ লাখ ৮৩ হাজার ৩০৮টাকা।

 

এদিকে ব্যাংক ইন্টারেস্ট পরিশোধ করতে গিয়ে লোকসানের কবলে পড়েছে বিডি থাই ফুড। শ্রম আইন অনুযায়ী, যেকোনো কোম্পানির কর পূর্ববর্তী মুনাফার ৫ শতাংশ কর্মীদের জন্য গঠিত ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডে (ডব্লিউপিপিএফ) জমা দিতে হয়। কিন্তু লােকসানের কারণে কর্মীদের জন্য সেই ফান্ডে কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখেনি কোম্পানিটি। এতে করে কোম্পানিটির কর্মীরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

 

তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, বিদায়ী বছরে কোম্পানির টার্নওভার বা বিক্রয় রাজস্ব হয়েছে ১৬ কোটি ৯১ লাখ ৯০ হাজার ৭৫৯ টাকা। এর আগের বছর যা ছিল ৫৯ কোটি ৫৫ লাখ এক হাজার ২৮১ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে টার্নওভার কমেছে ৪২ কোটি ৬৩ লাখ ১০ হাজার ৫২২ টাকা বা ৭২ শতাংশ।

 

পাশাপাশি বিডি থাই ফুডের নেট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো (এনওসিএফ) কমেছে তিন কোটি ৯৬ লাখ ৪৯হাজার ৯৬৩ টাকা বা ৭৪ শতাংশ।

 

এছাড়াও বিদায়ী বছরে কোম্পানির নিট লোকসান হয়েছে ১৩ কোটি ৪০ লাখ ৪৩ হাজার ৫৫৪ টাকা।

 

কোম্পানির এসব বিষয় জানতে কোম্পানি সচিব মো. নজরুল ইসলামকে (সিসি) একাধিকবার ফোন করে ও ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

 

বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম শেয়ারবাজার নিউজ ডটকমের এই প্রতিবেদককে বলেন, বিডি থাই ফুডের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপনার রিপোর্টের লিংক আমাকে পাঠিয়ে দিয়েন। আমি কমিশনের সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টের (বিভাগ) কাছে পাঠিয়ে দেবো। তদন্তে কাজে লাগবে। 

 

উল্লেখ্য, বিডি থাই ফুডের পরিশোধিত মূলধন ৮১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানা রয়েছে ৩১ দশমিক ৭১ শতাংশ, উদ‌্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার রয়েছে ৩৩ দশমিক ২১শতাংশ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৩৫ দশমিক ০৮শতাংশ।

 

বি:দ্র: দ্বিতীয় পর্বে থাকছে বিডি থাই ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের সামগ্রিক অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র।