ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট ঘোষণা আজ, আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে গতি ফেরানো, মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ আকারের জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা হচ্ছে আজ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত এই বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে ৫৫তম জাতীয় বাজেট এবং বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় সংসদে স্পিকার ড. হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এই বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি তাঁর প্রথম বাজেট।
এবারের বাজেটে অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দেশীয় শিল্প সুরক্ষা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কর ও ভ্যাট কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে।
আগামী অর্থবছরের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা প্রকল্প ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা থেকে সংস্থানের পরিকল্পনা রয়েছে।
বড় প্রকল্পগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের গতি ধরে রাখতে এই উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে। পাশাপাশি ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে আগামী অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে, যা মূলত গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার ও খাদ্য আমদানিতে ব্যবহৃত হবে।
রাজস্ব আদায়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি এনবিআর-বহির্ভূত উৎস থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং নন-ট্যাক্স রেভিনিউ থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
এনবিআরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আসবে ভ্যাট খাত থেকে ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা এবং আয়কর ও মূলধনী মুনাফা থেকে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। এছাড়া সম্পূরক শুল্ক, আমদানি শুল্ক, আবগারি শুল্ক ও রপ্তানি শুল্ক থেকেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজেটে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎস থেকে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্রসহ অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। ঋণের চাপ বাড়ায় সুদ পরিশোধে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
নতুন বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের জন্য পাঁচ বছরের আয়কর রোডম্যাপ ঘোষণা করা হচ্ছে। করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একইভাবে আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশেষ শ্রেণির করদাতা, নারী, প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা আরও বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তানের অভিভাবকদের জন্য অতিরিক্ত করমুক্ত সুবিধাও রাখা হয়েছে।
নিত্যপণ্যের বাজারে কিছু পণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি দেশীয় ইলেকট্রনিকস খাতে কর হ্রাসের মাধ্যমে স্বস্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফ্রিজ, এসি ও রেফ্রিজারেটরের উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট কমানো হচ্ছে। অন্যদিকে সিগারেট, নিকোটিনজাত পণ্য, প্রসাধনী, আমদানিকৃত খাদ্যপণ্য ও নির্মাণ সামগ্রীর ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
সরকার আগামী অর্থবছরে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি কর রোডম্যাপ ঘোষণার মাধ্যমে করব্যবস্থাকে আরও পূর্বানুমানযোগ্য করা সম্ভব হবে। সব মিলিয়ে এই বাজেট বাস্তবায়নই হবে নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এই বিভাগের আরও খবর
দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনে ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা সরকারের
ফিরল কালো টাকা সাদা করার সুযোগ
করপোরেট করহার অপরিবর্তিত, শর্তসাপেক্ষে ছাড় পাচ্ছে তালিকাভুক্ত কোম্পানি
খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তিতে মামলার আগে মধ্যস্থতা চায় সরকার
ব্যাংকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত জমায় কর দিতে হবে না