যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা কার্যকর, কী আছে ঐতিহাসিক চুক্তিতে?

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা কার্যকর, কী আছে ঐতিহাসিক চুক্তিতে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ উত্তেজনার পর সরাসরি শান্তি আলোচনার নতুন অধ্যায় শুরু হলো। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।


বুধবার (১৭ মার্চ) রাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে জি-৭ সম্মেলন শেষে নৈশভোজে অংশ নেওয়ার সময় চুক্তিতে সই করেন বলে জানায় হোয়াইট হাউস। একই সময়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও এতে স্বাক্ষর করেন। পরে উভয় পক্ষ ইলেকট্রনিকভাবে সমঝোতা স্মারক কার্যকর হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।


হোয়াইট হাউস জানায়, এর আগে ইলেকট্রনিকভাবে চুক্তিতে সই করেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। পরে প্রেসিডেন্ট পর্যায়ের সইয়ের মাধ্যমে তা পূর্ণতা পায়।


ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, আগামী শুক্রবার আলোচনাকারী দলগুলো জেনেভায় বৈঠকে বসবে। তবে ডিজিটালভাবে চুক্তি কার্যকর হওয়ায় কোনো আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হবে না।


চুক্তিতে যা আছে


সমঝোতা স্মারকের মূল দফাগুলোতে যুদ্ধবিরতি, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করা হয়েছে। এতে উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো—


যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এবং তাদের মিত্ররা সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের যুদ্ধ, হুমকি বা শক্তি প্রয়োগ না করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। লেবাননের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়েও সম্মতি রয়েছে।


দুই দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি করার জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ ও সংশ্লিষ্ট বাধা অপসারণ শুরু করবে। ৩০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের কথা রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে।


যুক্তরাষ্ট্র আরও জানিয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে তারা ইরানের কাছাকাছি অঞ্চল থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করবে।


অন্যদিকে ইরান পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগর অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা নেবে। হরমুজ প্রণালিতে চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ৬০ দিনের জন্য ফি ছাড়াই ব্যবস্থা চালু করার কথাও বলা হয়েছে।


অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় ঘোষণা এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের ইরান পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির অঙ্গীকার করেছে। একই সঙ্গে ইরানের তেল ও পেট্রোলিয়াম রপ্তানির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং, বিমা ও পরিবহন সেবা চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।


চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, ইরানের স্থগিত ও সীমাবদ্ধ তহবিল পুরোপুরি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে। এসব তহবিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হবে।


পারমাণবিক ইস্যু নিয়েও দুই দেশ আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে। ইরান পুনর্ব্যক্ত করেছে যে তারা কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ন্ত্রণ ও আইএইএ’র তত্ত্বাবধানে প্রক্রিয়া পরিচালনার কথাও উল্লেখ রয়েছে।


চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান অবস্থা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থাৎ নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ হবে না এবং কোনো অতিরিক্ত সামরিক বাহিনী মোতায়েনও করা হবে না।


সবশেষে বলা হয়েছে, এই সমঝোতা স্মারক সফলভাবে বাস্তবায়ন ও চূড়ান্ত চুক্তির শর্তগুলো পর্যবেক্ষণের জন্য একটি যৌথ নির্বাহী কাঠামো গঠন করা হবে।


জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের মাধ্যমে চূড়ান্ত চুক্তিকে বাধ্যতামূলক রেজ্যুলেশনে রূপ দেওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে।


সূত্র : বিবিসি ও আল-জাজিরা