লাখো গ্রাহকের হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া—এ কেমন বিমা ব্যবসা?
নিজস্ব প্রতিবেদক : বিমা—যে খাতটিকে মানুষ সবসময় ভেবেছে বিপদের দিনের শেষ আশ্রয়, দুর্দিনে আর্থিক ভরসার এক নিরাপদ জায়গা—সেই খাত নিয়েই এখন গভীর হতাশা আর ক্ষোভ জমছে। বছরের পর বছর কষ্ট করে প্রিমিয়াম জমা দেওয়া গ্রাহকেরা যখন প্রয়োজনের সময় তাদের প্রাপ্য টাকা ফেরত পান না, তখন সেই বিমাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার কারণ। এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া পড়ে আছে, আর লাখো মানুষ ঘুরছেন তাদের নিজের টাকার জন্য।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর কাছে গ্রাহকদের ৪ হাজার ৪০৩ কোটি ২০ লাখ টাকার দাবি বকেয়া পড়ে আছে। এই টাকার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন প্রায় ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫১৬ জন মানুষ। বছরে মোট ২৮ লাখ ৪৩ হাজার ৩৬৮ জন গ্রাহক ১৩ হাজার ১৫৮ কোটি ৫ লাখ টাকার দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু কোম্পানিগুলো পরিশোধ করেছে মাত্র ৮ হাজার ৭৫৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৪১ দশমিক ৬৯ শতাংশ গ্রাহক তাদের প্রাপ্য টাকা পাননি।
এই চিত্র শুধু পরিসংখ্যান নয়, এর পেছনে আছে বাস্তব জীবনের গল্প—কারও চিকিৎসার খরচ, কারও সন্তানের ভবিষ্যৎ, আবার কারও শেষ ভরসার সঞ্চয় আটকে আছে বছরের পর বছর।
সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা একটি কোম্পানিতে। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এককভাবে এই কোম্পানিতেই ৩ হাজার ২২৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা বকেয়া, যা পুরো খাতের ৭০ দশমিক ৩০ শতাংশ। সেখানে ৬ লাখ ২৪ হাজার ৬৯২ জন গ্রাহক দাবি তুললেও টাকা পেয়েছেন মাত্র ৫৮ হাজার ২১৫ জন, পরিশোধের পরিমাণ ২১৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ফলে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৪৭৭ জন গ্রাহকের ৩ হাজার ২২৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এখনো আটকে—প্রায় ৯৪ শতাংশ দাবিই বকেয়া।
একই রকম হতাশার ছবি দেখা যায় পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে। লাখ লাখ টাকা নয়, শত শত কোটি টাকা আটকে আছে সেখানে। এখানে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৬৭ জন গ্রাহকের ২৬৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। মোট দাবি ছিল ২৮০ কোটি ৮১ লাখ টাকা, কিন্তু পরিশোধ হয়েছে মাত্র ১১ কোটি ২১ লাখ টাকা—গ্রাহক সংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ৬৪০ জন।
সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ৮৪ হাজার ৯৪৩ জন গ্রাহকের ২২৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা বকেয়া। মোট দাবি ২৩৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, পরিশোধ হয়েছে ১১ কোটি ১৬ লাখ টাকা। প্রোগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ৪২ হাজার ১৬২ জন গ্রাহকের ১৬২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বকেয়া, যেখানে মোট দাবি ছিল ২০৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা এবং পরিশোধ হয়েছে ৪৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা (১১ হাজার ৪৩৪ জনকে)।
ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে মোট দাবি ছিল ৯৯৮ কোটি ২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৮৬৭ কোটি ১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হলেও ৩৭ হাজার ৮১৭ জন গ্রাহকের ১৩১ কোটি ১ লাখ টাকা এখনো বকেয়া রয়েছে।
বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ৩৩ হাজার ১৩১ জন গ্রাহকের ৭৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা বকেয়া। গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ১৮ হাজার ৩৩১ জন গ্রাহকের ৪৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা এবং হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ১৫ হাজার ২৪৭ জন গ্রাহকের ৩৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা এখনো পরিশোধ করা হয়নি।
রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বীমা কর্পোরেশনেও পুরোপুরি স্বস্তি নেই। এখানে ৪ হাজার ২৮০ জন গ্রাহকের ৬৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। মোট দাবি ছিল ৭৫৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, যার মধ্যে ৬৯০ কোটি ৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
দেশের একমাত্র বিদেশি কোম্পানি মেটলাইফে ১ হাজার ৭১৮ জন গ্রাহকের ৪৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা বকেয়া। তবে তারা মোট ২ হাজার ৯০২ কোটি ৪৩ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে ২ হাজার ৮৫৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে।
সান লাইফ ইন্স্যুরেন্সে ১ লাখ ১৬ হাজার ৪৬৩ জন গ্রাহক ৭৫ কোটি ৭০ লাখ টাকার দাবি তুললেও, ১৩ হাজার ১১৫ জনকে ৩৯ কোটি ২২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। ফলে ১ লাখ ৩ হাজার ৩৪৮ জন গ্রাহকের ৩৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা এখনো বকেয়া।
এছাড়া প্রাইম ইসলামী লাইফে ২৮ কোটি ৭ লাখ, গার্ডিয়ান লাইফে ১৩ কোটি ৭৪ লাখ, ন্যাশনাল লাইফে ১২ কোটি, প্রগতি লাইফে ৫ কোটি ৩৬ লাখ, মেঘনা লাইফে ৩ কোটি ৭০ লাখ, পপুলার লাইফে ৩ কোটি ২২ লাখ, সন্ধানী লাইফে ২ কোটি ৪৮ লাখ এবং ডায়মন্ড লাইফে ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা দাবি বকেয়া রয়েছে। আরও কয়েকটি কোম্পানিতে তুলনামূলক কম অঙ্কের বকেয়া থাকলেও সমস্যাটি প্রায় পুরো খাতজুড়েই বিস্তৃত।
অন্যদিকে, গ্রাহকের দাবি পরিশোধে ব্যর্থতার পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘন করে ব্যবস্থাপনা খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগও উঠেছে। দেশে কার্যরত ৩৫টি বেসরকারি জীবন বিমা কোম্পানির মধ্যে ২০টিই ২০২৫ সালে নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। এমনকি যেসব কোম্পানিতে বড় অঙ্কের দাবি বকেয়া রয়েছে, তারাই আবার কোটি কোটি টাকা ব্যবস্থাপনা খাতে বেশি খরচ করেছে, যা খাতটির সুশাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
তবে এর মধ্যেও কিছু ইতিবাচক দৃষ্টান্ত রয়েছে। আকিজ তাকাফুল লাইফ, আলফা লাইফ, লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ, মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স শতভাগ দাবি পরিশোধ করে দেখিয়েছে যে সুশাসন থাকলে এই খাতে আস্থা ধরে রাখা সম্ভব।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল তদারকি, অনিয়ম ও কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকটের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। এতে নতুন গ্রাহক বিমা করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন, ফলে প্রিমিয়াম আয়ও বাড়ছে না এবং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
তাদের মতে, যেসব কোম্পানি নিয়মিতভাবে দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সমস্যাগ্রস্ত কোম্পানিগুলোকে একীভূত করে শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলার কথাও বলা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটা এখন খুবই সরল, কিন্তু উত্তরটা জটিল—যে বিমা মানুষের বিপদের দিনে পাশে থাকার কথা, সেই বিমাই যদি বছরের পর বছর টাকা আটকে রাখে, তাহলে মানুষ ভরসা করবে কোথায়?
এই বিভাগের আরও খবর
আস্থার সংকটে বিমা খাত, আগ্রহ হারাচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা
সেরা ব্যাংকাস্যুরেন্স কর্মীদের স্বীকৃতি দিল স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এবং মেটলাইফ বাংলাদেশ
নিটল ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ২০২৫ সালের জন্য ১০% নগদ লভ্যাংশ সুপারিশ করেছে
সেরা ব্যাংকাস্যুরেন্স কর্মকর্তাদের স্বীকৃতি দিল ইবিএল ও মেটলাইফ বাংলাদেশ
করপোরেট ইন্স্যুরেন্স: আধুনিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার ভিত্তি