আস্থার সংকটে বিমা খাত, আগ্রহ হারাচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের বিমা খাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৫৮টি বিমা কোম্পানির মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১০টিতে বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে। তবে এসব বিনিয়োগও খুবই স্বল্প পরিসরের। এর মধ্যে একাধিক কোম্পানি থেকে বিদেশিরা পুরো বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
তথ্য অনুযায়ী, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স থেকে সব শেয়ার বিক্রি করে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পুরোপুরি বেরিয়ে গেছেন। একই সময়ে ঢাকা ইন্স্যুরেন্স থেকেও বিদেশিদের বিনিয়োগের একটি অংশ বিক্রি হয়ে গেছে। ফলে কোম্পানিটিতে তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণ রয়েছে গ্রীনডেল্টা ইন্স্যুরেন্সে। চলতি বছরের মার্চ শেষে কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় অপরিবর্তিত।
অন্যদিকে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে সামান্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৪ সাল শেষে বিদেশিদের হাতে ০.১৫ শতাংশ শেয়ার থাকলেও চলতি বছরের মার্চে তা বেড়ে ০.১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ নতুন করে কিছু শেয়ার কিনেছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।
তবে বেশিরভাগ কোম্পানিতেই বিদেশি বিনিয়োগ খুবই সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্সে ০.০১ শতাংশ, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্সে ০.০১ শতাংশ, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্সে ০.০৪ শতাংশ, পূরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্সে ০.১৬ শতাংশ এবং তাকাফুল ইসলামী ইন্স্যুরেন্সে ০.০৬ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে।
অন্যদিকে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ এবং ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সে বিদেশি বিনিয়োগ শূন্যে নেমে এসেছে। ঢাকা ইন্স্যুরেন্সেও বিদেশিদের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় কমে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে মূল কারণ আস্থার সংকট। দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল আর্থিক ভিত্তি, অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো বিমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থতা খাতটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ঝুঁকি ও রিটার্নের ভারসাম্য বিবেচনায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এই খাত থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।
তারা আরও বলছেন, একটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার জন্য শক্তিশালী বিমা খাত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশে এখনো অনেক কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে অসঙ্গতি, লভ্যাংশ প্রদানে অনিশ্চয়তা এবং গ্রাহকসেবায় দুর্বলতা রয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহে পড়ছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির ঘাটতিও পরিস্থিতিকে জটিল করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সুশাসন নিশ্চিত না হলে এবং গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধার না করা গেলে এই খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ফেরানো কঠিন হবে।
বিমা দাবির অর্থ পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতাও খাতটির সংকটকে আরও গভীর করেছে। বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে জীবন বিমা খাতে সক্রিয় পলিসির সংখ্যা ছিল ৭৮ লাখ ৯ হাজার ১২১টি। ২০২৫ সালের জুন শেষে তা কমে দাঁড়ায় ৬৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৯৭টিতে। অর্থাৎ আড়াই বছরে কমেছে ১০ লাখ ২৫ হাজার ৯২৪টি পলিসি।
একই সময়ে দাবির অর্থ পরিশোধের চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৬টি জীবন বিমা কোম্পানিতে মোট ৫ হাজার ৯৮৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকার দাবি উত্থাপিত হলেও পরিশোধ করা হয়েছে ২ হাজার ১০৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। বকেয়া রয়েছে ৩ হাজার ৮৮০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র ৩৫ শতাংশ দাবি পরিশোধ হয়েছে, বাকি ৬৫ শতাংশ এখনো বকেয়া।
সাধারণ বিমা কোম্পানিগুলোর অবস্থাও একই রকম। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুন সময়ে গ্রাহকরা ৩ হাজার ৬০৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকার দাবি উত্থাপন করলেও পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ৩০০ কোটি ১ লাখ টাকা। ফলে বকেয়া রয়েছে ৩ হাজার ৩০৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকারও বেশি, যা মোট দাবির প্রায় ৯২ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, দাবি পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসনের অভাব শুধু গ্রাহক আস্থাই কমাচ্ছে না, বরং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। ফলে বিমা খাতে বিদেশি বিনিয়োগে অনাগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে।
এই বিভাগের আরও খবর
লাখো গ্রাহকের হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া—এ কেমন বিমা ব্যবসা?
সেরা ব্যাংকাস্যুরেন্স কর্মীদের স্বীকৃতি দিল স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড এবং মেটলাইফ বাংলাদেশ
নিটল ইন্স্যুরেন্স পিএলসি ২০২৫ সালের জন্য ১০% নগদ লভ্যাংশ সুপারিশ করেছে
সেরা ব্যাংকাস্যুরেন্স কর্মকর্তাদের স্বীকৃতি দিল ইবিএল ও মেটলাইফ বাংলাদেশ
করপোরেট ইন্স্যুরেন্স: আধুনিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার ভিত্তি